ঘুরে দাঁড়াতে কি লাগে?

ঘুরে দাঁড়াতে কি লাগে?

সম্মেলনের তৃতীয় দিন, ১২ জুন ২০১৪। সময় বিকেল ৫টা। ডেলিগেটদের সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে আসবার মুহূর্ত। আজকে ছিল শতাধিক দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের আলোচনায় বসবার দিন। তাই এই মুহূর্তটাকেই যৌথভাবে আইসিএসএফ (International Crimes Strategy Forum) এবং Komola Collective-এর পক্ষ থেকে আমরা নির্ধারণ করেছিলাম প্রতিবাদ সমাবেশের ‘জিরো আওয়ার’ হিসেবে (বিস্তারিত ইভেন্ট: http://bit.ly/1oRjCD3)। যাতে করে ডেলিগেটরা বেরিয়ে যাওয়ার সময় একাংশের হলেও নজরে আসে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের এই নাগরিক প্রতিবাদটুকু। কারণ, এরই মধ্যে আমরা জেনে গেছি সম্মেলনের ক্লোজড সেশনগুলোতেও বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা হালে এতোটুকু পানি পায়নি গত দুই দিন।

প্রচণ্ড ট্রাফিকের সাথে ধস্তাধস্তি করে অক্সফোর্ড থেকে লন্ডন পর্যন্ত ড্রাইভে আজকেও প্রায় তিন ঘণ্টা লেগে গেল। কাছাকাছি এসে লক্ষ করলাম সম্মেলনের কেন্দ্রস্থল আজকে অনেকটাই যেন আলাদা। গত দু’দিনও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বেশ কড়াকড়ি ছিল, কিন্তু আজকের সমাপনী মুহূর্তের নিরাপত্তা বেষ্টনী গত দু’দিনকেও ছাড়িয়ে গেছে। রীতিমতো এয়ারপোর্টের মতো নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দুই দফার মেটাল ডিটেক্টর আর বডি সার্চ। ট্রে-র ওপর ব্যাগ মোবাইল ঘড়ি ওয়ালেট রাখো রে, বেল্ট খোলো রে, জুতোর সোল পরীক্ষা করো রে ইত্যাদি ইত্যাদি। চারপাশে দুটি ভিন্ন সংস্থার কঠোর-দর্শন সিকিউরিটির লোকজন, তার উপর যেদিকেই তাকাই দেখি শুধু পুলিশ আর পুলিশ! মন্ত্রী-ডেলিগেটদের ঘরে ফেরার মুহূর্তটাকে নির্বিঘ্ন করার কতোই না আয়োজন! সত্যিই চিন্তায় পড়ার মতো সমস্যা আমাদের সামনে। সমাবেশ করবো কিভাবে তাহলে?

কিন্তু এর মধ্যেই দেখি সাহসী মুখে একে একে জড়ো হচ্ছেন সবাই।

একদিন আগেই ফোন করেছিল হৈমন্তী। নিজের পরিচয়টুকু দিয়ে জানতে চেয়েছিল কিভাবে যুক্ত হতে পারে? আমি দিনক্ষণ জানিয়েছিলাম। সবার আগে কালো শাড়ি পরে নির্ধারিত সমাবেশস্থলে ও হাজির। ওকে দেশ থেকে এই সমাবেশের কথা জানিয়েছেন মেঘনাদি (মেঘনা গুহঠাকুরতা); আর মেঘনাদিকে জরুরি আবেদন পাঠিয়েছিলেন শিপ্রাদি (শিপ্রা বসু)। উল্লেখ না করলেই নয় — গত চার দিন ধরে শিপ্রাদির সাথে প্রায় সার্বক্ষণিকভাবেই ফেসবুকে যোগাযোগ হচ্ছিল। পরিচিত সব মানবাধিকার কর্মী আর নারীবাদী সহযোদ্ধাদের কারও সাথে যোগাযোগ করতে বাকি রাখেননি তিনি এই বৈশ্বিক সম্মেলনের হালচাল শুনে। (শিপ্রাদির মতো আরও একজন হাজির না থেকেও হাজির ছিলেন আমাদের সাথে, সেটা না উল্লেখ করলেই নয়। গত কয়েক দিন বেলজিয়াম থেকে জিয়া ভাই সকাল-বিকাল উৎকণ্ঠিতভাবে স্ট্যাটাস রিপোর্ট গ্রহণ করে গেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন।)

এদিকে মাথায় প্রচণ্ড মাইগ্রেন নিয়ে মোজাম্মেল ভাই এসে হাজির; ১৯৭১ সালে তিনি তখন তরুণ; লন্ডনে বসে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার কাজগুলোতে সরাসরি জড়িত ছিলেন। বয়স্ক এক বন্ধুকেও সাথে নিয়ে এসেছেন। গত তিন দিন আমাদের সব কার্যক্রমকে সফল করতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। সত্তরোর্ধ্ব সুলতান চাচা এসে হাজির; তিনিও ছিলেন ১৯৭১ সালের প্রবাসী সেই জনমত তৈরি করা মুক্তিযোদ্ধাদের একজন। তাঁর আরেক পরিচয় তিনি সদ্যপ্রয়াত নোরা (শরীফ) আন্টির স্বামী। বেঁচে থাকলে নোরা আন্টি আজকে আমাদের সাথে এসে শামিল হতেন, সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

শিশু রবিনকে সাথে নিয়ে হাজির নব্বইয়ের দশকের গণ আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও একসময়কার ছাত্রনেতা সৈকত আচার্য। শিশু সূর্যকে সাথে নিয়ে জয়া আর শান্ত। দুই শিশু কন্যাকে নিয়ে এসএলআর ও ভিডিও ক্যামেরা হাতে হাজির রাজীব। হাজির পূর্ব লন্ডনের সেক্যুলার আন্দোলনের বহু পুরোনো যোদ্ধা আনসার ভাই; আরও হাজির সওগাত ভাই, ফারুক ভাই এবং রাব্বানী। কালো শাড়ি পরে হাজির কমলা-কালেক্টিভ-এর লীসা আপা, যুক্তরাজ্য এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে বীরাঙ্গনাদের নিয়ে নির্মিত যাঁর থিয়েটার-উপস্থাপনা এখন অত্যন্ত সমাদৃত। এই উপস্থাপনাটিই বৈশ্বিক এই সম্মেলনে পর পর তিনদিনই যথাযথ গুরুত্বের সাথে পরিবেশিত হওয়ার কথা থাকলেও পরে রহস্যময় কারণে তা আর এগোয়নি। লীসা আপা একা আসেননি, তাঁর সাথে এসেছে তাঁরই মতো কালো শাড়ি পরে বন্ধু সোহিনী আর আননও। ‘ক্ষ’ এবং ‘লক্ষ্মীট্যারা’ ব্যান্ড দুটোতে গান গায় যে-সোহিনী তাকে নিশ্চয়ই পরিচয় করিয়ে দেয়ার দরকার নেই। হাজির তানিয়া, ওর লেখা উপন্যাস আর গল্পের সাথে কমবেশি সবাই নিশ্চয়ই পরিচিত। আমাদের সমাবেশে যোগ দিতে ডেলিগেটদের মধ্য থেকে হাজির হয়েছেন গবেষক নয়নিকা মুখার্জি, বীরাঙ্গনাদের নিয়ে যাঁর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে।

একসাথে এসে হাজির সুশান্ত আর ঝলক। সুশান্ত জেনোসাইড আর্কাইভ-এর জন্মলগ্ন থেকে জড়িত। ওরা ঢুকবার সময়ই অঘটনটা ঘটলো। সাথে করে ওরা নিয়ে আসছিল আজকের প্রতিবাদ কর্মসূচির ১৪ ফুট লম্বা ব্যানার, প্রদর্শনীর জন্য তৈরি স্যাম ভাইয়ের দুর্দান্ত নয়টি পোস্টার, আর আইসিএসএফ-এর ব্রিফিং পেপারের বেশ কিছু কপি। সম্মেলনস্থলে ঢুকবার সময়েই তল্লাশিতে সব ধরা পড়বার পর বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়।

এই লখিন্দরের বাসর ঘরের নিরাপত্তা বলয় ভেঙে প্রতিবাদ সমাবেশ করা দুরূহ। অথচ এরই মাঝে হাজির হয়ে গেছেন বহু মানুষ। কি করবো ভাবছি সবাই। মাথার মধ্যে কেন যেন সেই মুহূর্তে শুধু ঘুরপাক খাচ্ছিলো বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের সেই বাণী — ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’। হঠাৎ সোহিনী আর আনন প্রস্তাব করলো বক্তব্যগুলো হাতে লিখে ফেলার। বললেই তো আর হয় না। কাগজ নেই, কলম নেই; অথচ শেষ পর্যন্ত কারও ব্যাগ থেকে বেরুলো কাগজ, জোগাড় হল কলমও। টুকরো সাদা কাগজের ওপর হাতে লেখা হল: Where are Bangladesh’s rape survivors at this summit? আর, লিসা আপার ব্যাগ থেকে বেরুলো কালো টেপ। সম্মেলন শুরুর দিনের সকাল থেকেই তিনি সেটা ব্যাগে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন। ব্যস্, এই হলো আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর ঢাল-তলোয়ার!

এর পর হাতে-লেখা প্রতিবাদলিপি নিয়ে, টুকরো টুকরো কালো টেপ মুখে সেঁটে একরকম নিঃশ্বাস বন্ধ করে যা থাকে কপালে ভেবে সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম এক কাতারে। মুহূর্তের মধ্যে ঘটে গেল চমকপ্রদ একটি ঘটনা। উপস্থিত সব মানুষ প্রায় এক যোগে ঘুরে গেল আমাদের দিকে এবং এগিয়ে আসতে শুরু করলো। বিভিন্ন দিক থেকে জ্বলে উঠতে শুরু করলো ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইট, অনেকে আবার মোবাইল ফোন আর ট্যাবলেট কম্পিউটার তাক করে সমাবেশের ছবি তুলতে লেগে গেলেন। মজার ব্যাপার হলো — সিকিউরিটির লোকজন একটু দূর থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলো আমাদের, কিন্তু বাধা দিলো না। ভরসা পেয়ে এগিয়ে গেলাম সিকিউরিটি প্রধানের দিকে। জিজ্ঞেস করলাম — ‘কি জন্য আমরা সমাবেশ করছি জানো?’ বললো, ‘জানি’। বোঝা গেল আমাদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত-করা পোস্টার এবং ব্রিফিং নোটগুলো খুব খুঁটিয়ে পড়েছে সে। চোখে সহানুভূতি। একটু চোখ নাচিয়ে বললো — ‘বাধা তো দিইনি শেষ পর্যন্ত তোমাদেরকে, দিয়েছি?’ বললাম — ‘ধন্যবাদ, এবার বাজেয়াপ্ত করা জিনিসগুলো কি ফিরে পেতে পারি?’ মজার ব্যাপার হলো কোনো এক বিচিত্র কারণে পোস্টারগুলো ফেরত দিয়ে দিলো সে।

এর পর প্রায় দেড় ঘণ্টা নিরুপদ্রবে সমাবেশ চলেছে আমাদের। ততক্ষণে ভিড় করেছে গার্ডিয়ান থেকে শুরু করে ফ্রেঞ্চ টিভি, রেডিও-সহ আন্তর্জাতিক মিডিয়া আর ব্লগগুলোর পক্ষ থেকে বহু মানুষ। সাধারণ দর্শক আর ডেলিগেটরা তো আছেনই। কোথা থেকে যেন বিশ্বখ্যাত মানবাধিকার কর্মী বিয়াঙ্কা জ্যাগার এসে এক পর্যায়ে জড়িয়ে ধরলেন মুখে-কালো-টেপ-বাঁধা লীসা আপাকে। প্রত্যেকে জানতে চান — এই কালো শাড়ি, মুখে কালো টেপ আর এই পোস্টারের পেছনে যে-নারীরা তাঁদের গল্পগুলো কি? বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিকদের সাথে প্রশ্নোত্তরে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করতে ব্যস্ত আমরা কয়েকজন। এরই মাঝে হঠাৎ কাঁধে টোকা পড়লো। ফিরে তাকিয়ে দেখি — জামায়াতের যুদ্ধাপরাধী আসামীদের আইনজীবী টোবি ক্যাডম্যান। বিনীত গলায় ‘হ্যালো’ জানিয়ে বললো — আমাদের প্রতিবাদের সাথে সে নাকি “পুরোপুরি একমত”!! কি কি কথা হল ক্যাডম্যানের সাথে তা বিস্তারিত বলবো আরেক দিন।

আজকের দিন পাকিস্তান কিংবা তাদের দোসর ঘাতক ধর্ষক জামাত, আল-বদরদের নয়। আজকের দিন বাংলাদেশের, আজকের দিন বীরাঙ্গনাদের। অপূরণীয় ত্যাগ স্বীকার করে নিজ দেহে সন্তান ধারণ করা প্রতিটি মায়ের। আজকের দিন দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের লড়াইয়ে নামা প্রতিটি বাংলাদেশীর। সমাবেশ শেষ হলো একসময়। দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার প্রতিবাদে এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত সবাই, কিন্তু সেই ক্লান্তির ছাপ নেই কারো চোখেমুখে।

গত কয়েক দিন বৈশ্বিক সম্মেলনের মূল আয়োজকদের পাশাপাশি আমাদের বাংলাদেশ দূতাবাসও আমাদের বাক্যবাণ থেকে রেহাই পায়নি। তাই একটা তথ্য এখানে উল্লেখ না করাটা অন্যায় হবে। বৈশ্বিক সমাবেশের ডেলিগেটদের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য আগেই আমাদের ব্রিফিং পেপারটির (লিংক: http://bit.ly/1n8oMHY) প্রায় হাজার খানেক কপি লন্ডনের বাংলাদেশ দূতাবাসে পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। আজকে চমৎকৃত হয়ে জানলাম — এর মধ্যে দূতাবাস নিজ উদ্যোগে আমাদের ব্রিফিং পেপারটির আরও কয়েকশো কপি প্রিন্ট করে, নিরাপত্তা বলয় আর এ জাতীয় সম্মেলনের যাবতীয় লাল ফিতাকে পাশ কাটিয়ে, সেগুলো পৌঁছে দিয়েছে ডেলিগেটদের হাতে। সেজন্য তাঁদের প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

দিনরাত এক করে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে স্যাম ভাই, মাসুদ ভাই, সানজীব, মুহসিনা, আনুপ, রানা, বিদিত এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা আইসিএসএফ-এর ছেলেমেয়েরা। লন্ডনে না থেকেও তারা আসলে এই লড়াইয়ে শামিল ছিল প্রতি মুহূর্তে। সার্বক্ষণিকভাবে পাশে পেয়েছি কমলা-কালেক্টিভকে। বিশেষ করে লীসা আপা, ফয়সাল ভাই আর তানিয়াকে সবসময়ই পাশে পেয়েছি আমরা। বৈশ্বিক এই সম্মেলনে যতটুকু ইমপ্যাক্ট তৈরি করা গেছে গত তিন দিনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে, তা সম্ভব হয়েছে কেবলমাত্র সবার এই সামষ্টিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে।

অক্সফোর্ডের ফিরতি পথে গাড়ির জানালা খুলে দিয়েছি, হু হু করে ঠাণ্ডা বাতাস আসছে। মনে মনে ভাবছিলাম বাবার কথা। ১৯৭১-এর পর পর সদ্য ইন্টার্নি-করা ডাক্তার হিসেবে আব্বার কাজ পড়েছিল বীরাঙ্গনাদের সাথে। ধর্ষিতা মেয়েদের শুশ্রূষা, এমনকি গর্ভপাতের মতো দুঃসহ কঠিন কাজটি আমার বাবাকে করে যেতে হয়েছিল দিনের পর দিন। ঘরে ফিরে নাকি খাবার মুখে তুলতে পারতেন না। মনে মনে ভাবি, আমার বাবার মতো মানুষেরা সেই শক্তি কোথায় পেয়েছিলেন সেদিন? তাঁরাও তখন নিশ্চয়ই মনে মনে উচ্চারণ করতেন — ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’। এসব আকাশ-পাতাল ভাবছি, এমন সময় ফোন করলেন শ্রদ্ধেয় আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। বললেন — ‘দেশের জন্য অনেক বড়ো একটা কাজ করেছো আজকে তোমরা। তোমাদের ধন্যবাদ।’ আমি মনে মনে বললাম — ‘আসলে তেমন কিই-বা করতে পেরেছি আমরা! যেতে হবে আরও বহু দূর।’

 বিস্তারিত ও ইতিবৃত্ত: লিন্ক

 

অক্সফোর্ড, ১২ জুন ২০১৪